স্বামীর ইচ্ছা ১২তম পর্ব
স্বামীর ইচ্ছা ১৩তম পর্ব
রাকিবের প্রেমিকা অনুরিমা
আর থাকতে না পেরে রাকিব একটা বড়ো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলো। সে ঠিক করলো ছদ্মনাম নিয়ে অনুরিমার শশুরবাড়ি যাবে তার খোঁজ নিতে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। রাকিব সেই মোড়ের মাথায় এলো যেখানে সে আগের দিন অনুরিমাকে ড্রপ করেছিল। এক্সাক্ট ঠিকানাটা সে জানতো না। তাই অনুরিমার আর সমীরের নাম ধরে লোকাল লোকদের জিজ্ঞেস করে করে সে বাড়িটা খুঁজে পায়।
বাড়ির সামনে এসে রাকিব একবার থমকে দাঁড়ালো। রাকিবের বুকটা ধড়পড় করছিলো। না জানি কোন এক অজানা ঠিকানায় সে ঢুকছে। অনুরিমার বাড়ির লোক কিভাবে রিএক্ট করবে তার জানা নেই, সমীরবাবু বাড়িতে আছেন কিনা জানা নেই, সর্বোপরি যার জন্য সে এসছে, অনুরিমা, সে কিভাবে বিষয়টা দেখবে সেটাও জানা নেই তার। তাই অত সাত-পাঁচ না ভেবে রাকিব দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বাড়িতে প্রবেশ করলো।
কলিং বেল বাজালো। শাশুড়িমা দরজাটা খুললো। রাকিবকে দেখে তিনি যথারীতি চিনতে পারলেন না, “কে আপনি?”
রাকিব একটু ঘাবড়ে গিয়ে তোতলিয়ে উত্তর দিলো, “ননঃ ননন.. নমস্কার মাসিমা! আমি রাঃ.. রাকঃ.. রাকেশ… সমীরবাবুর পরিচিত। সমীরবাবু বা ওঁনার স্ত্রী বাড়িতে আছেন। উনিও মানে অনুরিমা দেবীও আমাকে চেনেন।…..”
কাননবালা দেবী রাকিব ওরফে তার কাছে রাকেশ বলে পরিচয় দেওয়া লোকটিকে একবার আপাদমস্তক দেখলো। এই লোকটাকে তো তিনি আগে কখনও দেখেননি! নামও শোনেনি। তবুও তিনি ভদ্রতার খাতিরে রাকিবকে সমীরের বিষয়ে অবগত করলেন। বললেন, “আপনি জানেন না সমুর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে?”
“কি?? সমু মানে সমীরের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে? কখন, কোথায়??”
“আর বলবেন না, তরতাজা ছেলেটা আমার কালকে অফিসের জন্য বেড়োলো, তারপর কি যে হলো কে জানে। হঠাৎ বিকেলের দিকে খবর এলো সমু কোন বাসন্তী হাইওয়ের ধারে গাড়ি নিয়ে খালে পড়ে গ্যাছে! কি কুক্ষণে যে সে সেখানে গেছিলো, কেনই বা গেছিলো কে জানে!”, এই বলে কানন দেবী কাঁদতে লাগলো।
রাকিব দুইয়ে দুইয়ে চার করে বুঝতে পারলো এই কারণে এই মহিলা এতবার অনুরিমাকে কল করছিলো। কাল ঘুসিঘাটা থেকে গাড়ি নিয়ে বেড়োনোর পর অনুরিমার হাসবেন্ডের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে! অনুরিমার আশঙ্কাটাই সত্যি ছিল!
রাকিব মনে মনে ভাবলো, “ইস্স কেন যে আমি অনু-কে ফোনটা ধরতে দিলাম না! হায় আ’ল্লাহঃ! অনেক বড়ো গুনাহঃ হয়েগেছে আমার দ্বারা! আমি এবার কি করে অনুরিমাকে মুখ দেখাবো এখন। না জানি কি অবস্থায় রয়েছে সে! আমাকে দেখলে যদি সে রিএক্ট করে? নাহঃ নাহঃ তা সে করবে না, কারণ এটা তার শশুরবাড়ি। আমাকে দেখলেও সে তার শাশুড়ির সামনে মেপে মেপে কথাই বলবে বলে মনে হয়।”

অনুরিমার শাশুড়ি কাঁদছে দেখে রাকিব ওরফে রাকেশ শান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলো, “চিন্তা করবেন না মাসিমা, সব ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা অনুরিমা আছে বাড়িতে? না মানে ওঁনার সাথে যদি সমীরের বিষয় নিয়ে একটু কথা বলা যেত, তাই আর কি!”
“আর বোলো না বাবা, বউমা তো কাল থেকে ভিরমি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। এই সবে জ্ঞান ফিরলো, ডাক্তার বলেছে রেস্ট নিতে।”
“কি অনুরিমা অজ্ঞান হয়েগেছিলো??” আঁতকে উঠে উচ্চস্বরে বলে উঠলো রাকিব।
সমীরের অত বড়ো অ্যাক্সিডেন্টে রাকিব যতনা শক্ড হয়েছিল তার চেয়ে বেশি অনুরিমার অজ্ঞান হয়ে যাওয়াটা তাকে বিচলিত করেছিল। রাকিব আর কোনো পারমিশন না নিয়েই সোজা বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লো। রাকিব ওরফে রাকেশের এই ব্যবহার দেখে কাননবালা দেবী হতবাক রয়েগেলো!
“অনুরিমা! অনুরিমা!”, রাকিব চিৎকার করে অনুরিমাকে ডাকতে লাগলো।
সঙ্গমের সময় অনুরিমার কান আন্দোলিত করছে রাকিবের শীৎকার
রাকিবের গলার আওয়াজ অনুরিমার কানে গিয়ে পৌঁছলো। এই স্বর তার চেনা। গতকালই এই স্বর তার কানের কাছে “আহ্হ্হঃ উহ্হ্হঃ” শীৎকার করেছে রমনের সময়। অনুরিমা তাই সেই শরীর নিয়েই সটান নিজের বিছানা থেকে উঠে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। দেখে রাকিব দাঁড়িয়ে ডাইনিং রুমে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলোনা সে।
“রাকিব তুমি….?”, নিম্নস্বরে মুখ ফস্কে রাকিবের আসল পরিচয় প্রকাশ করে ফেললো অনুরিমা। সে জানতো না তার প্রেমিক এখানে ভুয়ো পরিচয় দিয়ে এসছে। রাকিব নামটা কাননবালা দেবীর কানে গেলো। সে প্রশ্ন করলো, “এই ছোড়া তোমার নাম কি বলেছিলে যেন? বউমা যে বলছে রাকিব! তুমি তো আমাকে রাকেশ পরিচয় দিলে।….. তার মানে তুমি মু’সলমান! মিথ্যে পরিচয় দিয়ে এই মল্লিকবাড়িতে ঢুকে এসছো! ছ্যাঃ ছ্যাঃ ছ্যাঃ, মাগো! সব্বনাশ হলো! গোটা বাড়িটা এখন গোবরজল দিয়ে মুছতে হবে! তোমার মতলব কি হে যবনের ব্যাটা? আর বউমা তুমি এই ম্লেচ্ছ কে চেনো কি করে?”
শাশুড়ির রুদ্ররূপ দেখে অনুরিমা ঘাবড়ে গেলো। সে তো তার শাশুড়িকে চেনে, কতটা দজ্জাল জানে! তাই সবসময়ে অনুরিমা কাননবালা দেবীকে ভয়ে সমঝে চলে। সেইসময় অনুরিমা বুঝলো তাকে আগে তার পিঠ বাঁচাতে হবে। এখন ন্যায় অন্যায় দেখলে হবেনা। আপনি বাঁচলে তবে প্রেমিকের নাম! তাই স্বার্থপর তাকে হতেই হবে। অত বুল বা প্রেমিক নয়, তার শাশুড়ি যদি এইটুকুও জানে যে রাকিব বেশ ভালো মতো পরিচিত অনুরিমার কাছে তাহলে তার আর রক্ষে থাকবেনা। মল্লিকবাড়ির পাত তো তার উঠবেই, সাথে মান সম্মানও খোঁয়া যাবে।
তাই অনুরিমা aggressively (আগ্রাসী হয়ে) বললো, “জানিনা মা, এ কে! কোথা থেকে চলে এসছে!”
“অনুরিমা!”, বলেই রাকিবের ডান চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল টপ করে পড়লো।
কিন্তু জাঁদরেল শাশুড়ি এইটুকু থেকে ক্ষান্ত হয়নি। সে তার বউমা কে জিজ্ঞেস করলো, “তাহলে ও আমাদের বাড়ির ঠিকানা, তোমার আর সমুর নাম জানলো কি করে? সর্বোপরি তুমিই বা কি করে জানলে এ রাকেশ নয়, রাকিব??”
“আসলে …. আসলে …..”, অনুরিমা বুঝে পাচ্ছিলোনা কি বলবে। সচরাচর সে মিথ্যে কথা বলেনা। তার উপর যেভাবে তার শাশুড়ি তাকে চেপে ধরে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করছে তাতে সে আরোই ঘাবড়ে গ্যাছে। ঠিক সেই মুহূর্তে রাকিব নিঃস্বার্থ এক প্রেমিকের মতো ত্রাতা হয়ে উঠে অনুরিমাকে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করলো। কারণ অনুরিমার স্বভাব বিপরীতে রাকিব বেশ ভালোই গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলতে পারে। আসলে সে যে প্রফেশনে আছে সেখানে মাঝে মাঝেই স্ক্যান্ডেল হওয়ার ভয় থাকে। তাই উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োগ করে মিথ্যে কথা এমনভাবে সাজিয়ে বলতে হয় যেন তা সত্যি এবং বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় সকলের। এক্ষেত্রেও সে তাই করলো অনুরিমাকে বাঁচাতে ……
“আসলে আমি সমীরবাবুর অফিসে কাজ করি। কারণে অকারণে ওনার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার চেয়ে থাকি। তিনি তাই আমায় এড়িয়ে চলেন। অনেকবার কল করতাম টাকার জন্য, বিভিন্নসময়ে সেই কারণে বিরক্তও হয়েছেন উনি। আমি গরিব মানুষ, টাকার খুব দরকার। তাই নিলজ্জ্যের মতো লোকের পিছু পিছু ঘুরি। অনুরিমা ম্যাডাম আমার অফিসের মনিব সমীরবাবুর স্ত্রী। তাই তাকে চিনবোনা, এমন দৃষ্টতা আমার কই। কিন্তু ম্যাডাম আমাকে চেনেনা এইকারণেই বলেছেন কারণ উনি জানেন আমি টাকার জন্য ওঁনার স্বামীকে কতোটা বিরক্ত করি। সমীরবাবুও অনেকদিন ধরে আমার ফোন ধরা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তাই আজ বাড়ি অবধি চলে এসছি টাকা ধার চাইতে। এসে শুনলাম আপনাদের পরিবারের এই দুর্যোগের খবর। আপনারা অভিজাত গোঁড়া হি’ন্দু পরিবার, তাই যদি রাকিব নাম শুনে ঢুকতে না দেন, সেই কারণেই এই নামবদল।”
“তা মনিবের স্ত্রীকে নাম ধরে ডাকছিলে কেন এতক্ষণ ধরে? এত সাহস পাও কোত্থেকে বাছা?”
“ভুল হয়েগেছে মাসিমা, আর হবেনা। আসলে আমি মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ, অফিসে দারোয়ানের কাজ করি। তাই কখন স্যার/ম্যাডাম বলে ডাকতে হয়, আর কখন কাকে নাম ধরে, সেই জ্ঞান গম্মি আমাদের মতো মানুষদের সবসময় থাকেনা।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে, একটু সবুর করো এখানে। মল্লিকবাড়ি থেকে কোনো ভিখারীও খালি হাতে ফেরেনা। আমার ছেলেটা এখন হাসপাতালে, তাই কারোর উপকার করলে যদি পুণ্যি লাভ হয়, আর তা থেকে যদি আমার সমুটা সুস্থ হয়ে ওঠে তবে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারেনা”, এই বলে কাননবালা দেবী নিজের ঘরে গেলো ক্যাশ বাক্সটা খুঁজতে।
রাকিব অনুরিমার দিকে চেয়ে রইলো। কিন্তু অনুরিমার চোখ লজ্জা ও অপরাধবোধে নিম্নগামী হয়েগেছিলো। তার ধক্ ছিলোনা রাকিবের চোখে চোখ রাখার। রাকিব কি সত্যিই এই ব্যবহারটা ডিজার্ভ করতো? মনের ভেতর থেকে উত্তর এলো নাহঃ, করতো না ডিজার্ভ! অনুরিমা তাও সাহস করে চোখ তুলে এক পলক রাকিবের দিকে তাকালো। চোখে চোখ মিলতেই রাকিব দু’পা অনুরিমার দিকে এগিয়ে গেলো। তা দেখে ভয়ে অনুরিমা তিন পা পিছিয়ে এলো। রাকিব বুঝলো এটি সঠিক জায়গা নয় তার প্রেমিকার সাথে বার্তালাপ করার, তাও আবার তার শাশুড়ির সামনে! তাই সে আর এগোলো না। উল্টে নিজের কদম দু’পা পিছিয়ে পূনরায় পূর্বের স্থানে দন্ডায়মান হয়ে রইলো।
ঘর থেকে কাননবালা দেবী নিজের ক্যাশ বাক্স হতে কিছু টাকা নিয়ে এসে রাকিবকে দিয়ে বললো, “এই ধরো বাপু, হাজার পাঁচেক টাকা! আশা করছি এতে তোমার হয়ে যাবে। এবার মানে মানে বিদায় হও দেখি। তবে শোনো মল্লিকবাড়ি বলে পার পেয়ে গেলে, নাহলে মু’সলমান হয়ে হি’ন্দু নাম ধরে বাড়িতে ঢুকেছো জানতে পারলে পাড়ার লোক তোমার যে কি হাল করতো তা স্বয়ং ঈ’শ্বরই জানেন।”
“ধন্যবাদ মাসিমা। আপনি সত্যিই অনেক দয়ালু। আ’ল্লাহর কাছে দোয়া করি আপনার ছেলে এবং ওঁনার স্বামী সমীরবাবু যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে। আপনার ছেলে বউয়ের জুটি সত্যি রা’ম-সী’তার জুটি, কেউ আলাদা করতে পারবে না তাদের।”
“বালাই ষাট! ওদের কোন আঁটকুড়ের ব্যাটা আলাদা করতে যাবে, তুমি?”
“নাঃ নাঃ, আমার অত ক্ষমতা কোথায়। আমি সামান্য একজন দারোয়ান, যে মানুষের ভালোলাগা ভালোবাসার অনুভূতি গুলো পাহাড়া দিই, যাতে কোনো দমকা হাওয়ায় সেগুলো নষ্ট না হয়ে যায়। আমার কি কারোর সম্পর্ক ভাঙা সাজে”, ছল ছল চোখে কাঁদো কাঁদো গলায় অনুরিমার দিকে তাকিয়ে বললো রাকিব।
“তুমি কি বলছো বাপু, কিছুই বুঝতে পারছিনা। যাও তো এখন, বাজে বকে মাথা খারাপ করোনা। মেলা কাজ পরে আছে, তারপর ছেলেকে দেখতে হাসপাতালে যেতে হবে। তুমি এখন এসো, কেমন”, এই বলে খানিকটা দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হলো রাকিবকে মল্লিকবাড়ি থেকে।

রাকিবের বিরহে বিছানায় মূর্ছা গ্যাছে অনুরিমার কোমল শরীর
রাকিবকে এইভাবে অপমানিত হয়ে চলে যেতে দেখে অনুরিমার অশ্রু কোনো বাঁধ মানছিলো না। নিঃশব্দে অঝোরে ঝরে পড়ছিলো চোখ দিয়ে। কিন্তু রাকিবকে আটকানোর বা রাকিবকে করা অপমানের প্রতিবাদ করারও তো উপায় নেই তার। তাই সে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গিয়ে দরজায় খিল দিয়ে দিলো। বিছানায় শরীরটা ফেলে দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। সে জানতো রাকিবের এত অপমান কোনোভাবেই প্রাপ্য ছিলোনা। তবু রাকিব তার আর ওর মধ্যেকার সম্পর্কের কোনো কথা ফাঁস করেনি। কি অদ্ভুত ও বৈচিত্রময় এই পুরুষ জাতি! একজন স্বামী হয়ে সব অধিকার পেয়েও তার স্ত্রীকে অন্যের বিছানায় দেখতে চায়। অপরজন কোনো অধিকার ছাড়াই নিস্বার্থভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, ঠিক স্বামীর মতো।
সমীর ও অনুরিমার বিয়ের ছবি, তবে বর্তমানে অনুরিমার প্রকৃত স্বামীর অধিকার কার পাওয়া উচিত?
হঠাৎ ঝড়ে মুহূর্তেই হয়ে যায় সবাই পর, সম্পর্কের আরেক নামই তো তাসের ঘর।
মল্লিকবাড়ি থেকে বেরিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে রাকিব একবার তাকালো নিজের হাতের দিকে। নাহঃ, নিজের হাতের লিখনী পড়ার জন্য নয়, সে তো আর জ্যোতিষী নয়, নিজের হাতের রেখা গণনা করে জানতে পারবে অনুরিমা তার ভাগ্যে আদেও আছে কিনা। সে সামান্য একজন বুল, অনুরিমার শাশুড়ির চোখে এক মু’সলিম দারওয়ান, তাছাড়া আর কিচ্ছু না। হাতে থাকা অনুরিমার শাশুড়ির দেওয়া পাঁচ হাজার টাকা দেখে মনে মনে ভাবলো তার ভালোবাসার দাম কি মাত্র ৫০০০ টাকা! এইটুকুই কি মূল্য হয় গরিবের ভালোবাসার দাম! কে জানে…..
ওদিকে বেলা গড়িয়ে বিকেল হতে চললো। কাননবালা দেবী হসপিটালে ছেলেকে দেখতে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় করছিলো। অনুরিমা যেতে চাইলো কিন্তু কানন দেবী অনড়, তাকে নিয়ে যাবেনা। মনে মনে তো সে অনুরিমার উপর ক্ষেপেই ছিল গতকাল হঠাৎ কোথাও উধাও হয়ে যাওয়ার জন্য, পরে কৈফিয়তও চাওয়া হয়নি, তার আগেই অনুরিমা সমীরের অ্যাক্সিডেন্টের খবর শুনে অজ্ঞান হয়ে পরে। সর্বোপরি অনুরিমাকে ডাক্তার রেস্ট নিতে বলেছিলো তাই আরোই কানন দেবী অনুরিমাকে নিয়ে যেতে রাজি হলো না।
হসপিটালে নানা রোগীর আনাগোনা, এরই মধ্যে দূর্বল শরীর নিয়ে অনুরিমা গেলে আরো ভুগতে হতে পারে। অনুরিমাকে ভুললে চলবে না তার একটা ছোট্ট মেয়েও আছে, নিজের না হোক তার ব্যাপারটা তো একবার ভাবা উচিত ওর। এই বলে অনুরিমাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে বাড়িতে রেখে সমীরের মা বেরোলো রুবি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। বউমাকে আস্বস্ত করলেন কোনো ভালো খবর অর্থাৎ সমীরের জ্ঞান ফেরার খবর থাকলে তৎক্ষণাৎ জানাবেন তিনি।
ঠিক যেন রাকিব ও অনুরিমা
অনুরিমা আরোই হাসপাতালে যেতে চাইছিলো কারণ বাড়িতে থাকলেই খালি তার রাকিবের কথা মনে পড়ছিলো। সে ভালোই বুঝেছিলো যে রাকিব কষ্ট পেয়েছে তাকে শাশুড়ির সামনে অস্বীকার করায়। একবার ভেবেওছিলো রাকিবকে ফোন করবে, তারপর ভাবলো আগে সমীর পরে রাকিব। এই মুহূর্তে সমীরের স্ত্রী হিসেবে তার কথাই আগে ভাবা উচিত, কিন্তু মন তো খালি উল্টো সুর গাইছিলো। তবে কি আস্তে আস্তে অনুরিমার মনে সমীরকে সরিয়ে রাকিব জায়গা করে নিতে বসেছিলো?
এই কিছুদিনের মধ্যে সমীরের কাকোল্ড ফ্যান্টাসির বদন্যতায় তাকে মোট তিনজন পুরুষের মুখাপেক্ষী হতে হয়েছিল। প্রথমে ভিক্টোরিয়া-তে যৌনবিশেষজ্ঞ ডাক্তার রাজীবের সাথে ঘনিষ্ট মুহূর্ত রিক্রিয়েট করার রিহার্সাল, তারপর সুচরিতার প্রাক্তন স্বামীর সাথে বৃষ্টি ভেজা বিকেলে এক লজে যৌনমিলনের মধ্যে দিয়ে করা কাকোল্ড প্রক্রিয়ার প্রাকটিস, সর্বশেষ ঘুসিঘাটায় সমীরের উপস্থিতিতে রাকিবের সহায়তায় কাকোল্ড ক্রিয়া সম্পন্ন। এতকিছুর পর কি আর স্বামীর প্রতি কোনো টান কোনো স্ত্রীরই অবশিষ্ট থাকে? থাকার কথা? কিন্তু অনুরিমার ছিল, তখনও ছিল, কিছুটা হলেও। কারণ সে একদিন সমীরকে মনে প্রাণে ভালোবেসেছিলো, সেই টানেই হয়তো। তবে পূর্বের তুলনায় এখনকার অনুরিমা বড্ড বেশি উদাসীন হয়ে পড়েছে চারিপাশে তাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ দেখে।
কাকোল্ড প্রক্রিয়া — ঠিক যেরকমটা সমীর প্রাথমিকভাবে কল্পনা করে অনুরিমার যন্ত্রণা বাড়িয়েছিল
হাসপাতালে গিয়ে কাননদেবী জানতে পারেন সমীরের জ্ঞান ফিরেছে। তাঁর মন আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। তবুও সে অনুরিমাকে তখন জানায় না। আগে নিজের ছেলেকে দেখতে চায়। ভিসিটিং আওয়ার্স এর জন্য ওয়েট করছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। তিনি এইচডিইউ (HDU) তে যাওয়ার সুযোগ পান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে। গতকাল ইমার্জেন্সি থেকে সোজা সমীরকে আইসিইউ (ICU)-তে অর্থাৎ Intensive Care Unit-এ শিফট করা হয়েছিল। জ্ঞান ফিরে আসার পর এইচডিইউ অর্থাৎ High Dependency Unit-এর বেডে দেওয়া হয় তাকে। সাধারণত কোনো পেশেন্ট-এর কন্ডিশন recover করতে শুরু করলে তাকে ICU থেকে HDU তে ট্রান্সফার করা হয়। তার মানে সমীর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলো। That’s good for his family, but is it good for Rakib as well? God knows…….
সমীরকে দেখামাত্রই কানন দেবীর অশ্রু বাঁধ ভেঙে নয়ন হতে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। মা কে দেখা মাত্রই খুব কষ্ট করে হলেও প্রথমে সে অনুরিমার খোঁজ করে। ভাঙা গলায় আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে অনুরিমা বাড়ি ফিরেছে কিনা? কাননদেবী তো অত কিছু জানতেন না, তিনি ভাবলেন স্বাভাবিক কারণেই সমীর তার স্ত্রীয়ের খোঁজ নিচ্ছে।
“আমার বাবুটা তো নিজের বউকে কম ভালোবাসেনা!”, এইভেবে তিনি সমীরকে বললেন অনুরিমা তো কালকেই চলে এসছে বাড়ি। পাল্টা সমীর জিজ্ঞেস করলো তাহলে অনু এলোনা কেন তাকে দেখতে। কাননদেবী খোলসা করে বললো না যে অনু কালকে বাড়ি ফিরে সমীরের অ্যাক্সিডেন্টের খবর শুনে অজ্ঞান হয়েগেছিলো। এখন সে একটু দুর্বল রয়েছে তাই তিনি বউমাকে সাথে করে নিয়ে আসেননি। এসব শুনলে যদি সমীর বিচলিত হয়ে পরে? থাক, তার আগে সুস্থ হয়ে উঠুক, দুজনেই।
রাকিবের ছদ্মনামে বাড়ি আসার ব্যাপারটাও কাননদেবী গোপন করে গেলো। রাকিব লোকটা কেমন তা এক দেখায় জানা সম্ভব নয়। কে জানে তাঁর ছেলে লোকটাকে আদেও পছন্দ করে কিনা! শুধু শুধু সেই লোকটার নাম বাবুর (সমীর) সামনে নিয়ে ওকে চিন্তামগ্ন করে লাভ নেই। এইভেবে তিনি বাড়ির বিষয়ে চুপ থাকলেন ছেলের সামনে। ভেবে নিলেন বাড়ির সব বিষয় তিনি আপাতত একাই সামলে নিতে পারবেন।…..
অনুরিমাকে দেখার জন্য নাছোড়বান্দা সমীরকে তার মা বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “বউমা যদি আসতো তাহলে তিন্নিকে কে দেখতো? তোর বাবার কাছে তো মেয়েটা থাকেই না। হয় আমার কাছে নাহয় বউমার কাছে থাকতে পছন্দ করে। মিথ্যে বলবোনা, যদিও বউমা আস্তে চেয়েছিলো খুব, কিন্তু আমিই বারণ করলাম তিন্নির কথা ভেবে।”
“কেন বারণ করলে? আমার যে ওর সাথে অনেক কথা বলার আছে। আচ্ছা মা, কালকে যখন অনু এলো ওর সাথে কি আর কেউ এসেছিলো বাড়িতে?”
“কই….. না তো!…..”
“জিজ্ঞেস করেছিলে কোথায় গেছিলো? আমার অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়ে ওর কিরকম প্রতিক্রিয়া ছিল? বলো না মা, বলো…..”
“তুই এরকম করে বউমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিস কেন? এতটা উত্তেজিত হোসনা, ডাক্তার তোকে বিশ্রাম নিতে বলেছে। পরে সব কথা হবে। আমাদেরও তো অনেক প্রশ্ন জমে আছে তোকে নিয়ে, তুই বা কেন ওই বাসন্তী হাইওয়ের দিকে গেছিলিস? ওখানে তো তোর অফিস নয়। পুলিশ তো কাউকে না পেয়ে শেষে আমাকে জেরা করছিলো, আমি এসব ব্যাপারে কিছু জানি কিনা। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। উল্টে আমি তো অবাক, পুলিশের কাছ থেকে শুনে যে তুই ওরকম একটা নির্জন জায়গায় গেছিলিস!….. কিন্তু থাক, এখন এসব নিয়ে কোনো কৈফিয়ৎ তোকে দিতে হবেনা। আর তুইও বউমার ব্যাপারে অত খুঁটিনাটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে চাইবি না। আগে তোরা দুজনে সুস্থ হও, তারপর স্বামী স্ত্রী একসাথে বসে সকল প্রশ্ন-উত্তর পর্ব ঝালিয়ে নিস্।”
“দুজনে সুস্থ হও মানে? অনুরিমার কি কিছু হয়েছে?”
“এই রে! মুখ ফস্কে এটা কি বলে ফেললাম বাবু কে”, মনে মনে ভেবে কাননদেবী জিভ কাঁটলেন দাঁতে। তারপর কোনোমতে নিজের বাক্যসমূহ সামলে সাজিয়ে নিয়ে বললেন, “ওঃ.. ওহঃ কিছু না। তোর চিন্তায় চিন্তায় বউমার বিপি-টা লো হয়েগেছিলো, এই কারণেও আমি ওকে আনিনি।”
“সত্যি? তুমি সত্যিই বলছো? অনুরিমা আমার কথা ভেবে শরীর খারাপ করেছে?”
অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে কাননবালা দেবী বললেন, “এতে অবাক হওয়ার কি আছে বাবু? তুই ওর স্বামী হোস, ও তোর জন্য চিন্তা করবে না তো আর কার জন্য করবে?”
মা-কে আর কে বোঝাবে যে এখন তাদের মধ্যেকার সমীকরণ হয়তো অনেকটাই বদলে গ্যাছে গতকালের পর থেকে। যার বীজ অবশ্য সে নিজেই পুঁতেছিলো অনেক আগে। এখন তাদের জীবনে তৃতীয় বিধর্মী এক ব্যক্তির আগমণ ঘটেছে, যা তাদের সবকিছু একেবারে ওলটপালট করে রেখে দিয়েছে। মা তো আর জানেনা তার বউমা গতকাল রাকিব নামক এক ব্যক্তিকে নিজের শরীরের ভাগ দিয়ে এসছে, যার উপর এতদিন একচ্ছত্র অধিকার ছিল তার ছেলের, শুধু তার ছেলের।
ঘুসিঘাটার পোড়োবাড়িতে ঘটা সেই ঐতিহাসিক কাকোল্ড দৃশ্য
সমীরের আশংকা ছিল অনুরিমা দেহের সাথে সাথে মনটাও রাকিবকে দিয়ে আসেনি তো? তাই জন্যই তো বারংবার মা কে জিজ্ঞেস করছিলো অনুরিমা সত্যিই কিছু যায় এসেছে কিনা তার দূর্ঘটনার খবর শুনে। এতটাই এক্সপেকটেশন পড়েগেছিলো সমীরের নিজের স্ত্রীয়ের প্রতি!
ভিসিটিং আওয়ার্স শেষ হতে চললো। অনুরিমা ক্রমাগত নিজের শাশুড়িকে ফোন করে যাচ্ছিলো সমীরের খবর নেওয়ার জন্য। কিন্তু কাননবালা দেবীর ফোন সাইলেন্ট ছিল। সমীরকে দেখে বেরিয়ে আসার পর দেখলেন ফোনে তাঁর অনেক মিসকল অনুরিমার নাম্বার থেকে। তিনি অনুরিমাকে কল ব্যাক করলেন।
“হ্যালো মা, আপনার ছেলে কেমন আছে?”
“আর চিন্তা করোনা বউমা, সমুর জ্ঞান ফিরে এসছে। ওর সাথে কথা হয়েছে, তোমার কথাও জিজ্ঞেস করছিলো, বললাম বাড়িতে সব ঠিক আছে চিন্তা না করতে। এখন ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি সমুর হেল্থ কন্ডিশন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে, মানে কতদিনে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে, কবে ডিসচার্জ হবে, কি কি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে ইত্যাদি।…..”
“আপনি কি সমুর কাছে রয়েছেন? আমার সাথে কথা বলিয়ে দেবেন?”
“না, ভিসিটিং আওয়ার্স তো শেষ, এখন তো কেবিন থেকে বেরিয়ে এসছি।”
“আপনাকে যে বলেছিলাম ওর জ্ঞান ফিরলে আমাকে জানাতে, ওর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো। আপনি তো আমাকে নিয়েও গেলেন না, একা একা চলে গেলেন!……”
“শোনো বউমা, আমাকে রাগ দেখিও না। কাল যখন তোমাকে সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল তোমাকে ফোন করেও পাওয়া যায়নি। এই বুড়িটা-কে সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে ছুটে আসতে হয়েছিল ছেলের জন্য। তুমি স্ত্রী হিসেবে কোন দায়িত্বটা পালন করেছিলে শুনি যে আজকে আমাকে কথা শোনাচ্ছ? যতদিন সমু হাসপাতাল থেকে ছাড়া না পাচ্ছে তুমি আমার ছেলের মুখ দেখতে পারবে না, এটাই তোমার শাস্তি কালকে প্রয়োজনের সময় না আসার! তোমার বেশি বন্ধুপ্রীতি! তা স্বামীর থেকেও বেশি প্রিয় তোমার বন্ধু হলো? কি যেন নাম সুচরিতা না কি, তার দেখভালের জন্যই তো কোন এক নার্সিংহোমে গেছিলে! এদিকে নিজের স্বামীটা যে দূর্ঘটনার কবলে পরে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলো তার দিকে মহারানীর কোনো খেয়াল নেই। মানছি আগে থেকে এ ব্যাপারে জানার কোনো উপায় ছিলোনা, কিন্তু বাইরে গেলে মানুষ ফোনটা তো অন রাখে, দরকারে অদরকারে খবর পাওয়ার জন্য! সেই জ্ঞান বুদ্ধিও তোমার লোপ পেয়েছে। কালকে বাড়ি ফিরে ভিরমি খেয়ে পড়েগেছিলে বলে কি ভাবলে আমার রাগ গলে জল হয়েগেছে? মোটেও না! একবার আমার বাবুটা-কে সুস্থ হতে দাও, তারপর এর বিহিত করছি আমি। দরকার পড়লে তোমার মা বাবা কে ডাকবো, বলবো কিরকম মেয়েকে মানুষ করেছেন আপনারা যে বিপদে আপদে পাশে পাওয়া যায়না, উল্টে ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়াতে যায়। রাখো ফোনটা এখন”, বলে ঝাঁঝিয়ে উঠে মুখের উপর ফোনটা কেটে দিলেন তিনি।
সমীর-অনুরিমা
শাশুড়ির কাছে বকা খেয়ে বিছানায় মুখ গুঁজে ফের অঝোরে কাঁদতে লাগলো অনুরিমা। নিজের ভাগ্যকে দুষতে লাগলো। তার কিই দোষ। সে তো এই পথে যেতে চাইনি। তার স্বামী বাধ্য করলো তার সাথে ব্যাভিচারিতা করতে, অসতী হতে। তারপর সেই দৃশ্য দেখে নিজেই আঘাত পেয়ে দূর্ঘটনা ঘটিয়ে বসলো। আর এখন সব দোষ হলো তার? হায় কপাল! মেয়েদের জীবন এমন কেন হয়? কেন কেউ তাদের বোঝেনা? Not even the women around them understand their miseries…… উদাহরণ — কাননবালা মল্লিক, অনুরিমার শাশুড়ি।
সমীর ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলো। ওদিকে শাশুড়ি, বউমার উপর ফতোয়া জারি করেছিল যতদিন না তার ছেলে হসপিটাল থেকে ছাড়া পাচ্ছে, ততদিন অনুরিমা বাড়ির বাইরে পা পর্যন্ত রাখবেনা, সমীরকে দেখতে যাওয়া তো দূরের কথা। রাকিবও ফোন করে করে অনুরিমাকে পাচ্ছিলো না, কারণ অপরাধবোধ ও শোকে কাতর হয়ে অনুরিমা সবার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল।
বাড়িতে শশুর শাশুড়ি তাকে কোণঠাসা করে দিয়েছে। অনুরিমার শশুরমশাই ব্রজমোহন বাবু নেহাতই মাটির মানুষ। তার মন চাইছিলো না বউমার সাথে কথা বন্ধ করে তাকে বাড়িতেই বয়কট করতে। কিন্তু পরিবারে কাননবালা দেবীর উপর কারোর কথা চলেনা, স্বয়ং বাড়ির কর্তা ব্রজমোহন বাবুরও না। তিনি তাঁর স্ত্রীকে যথেষ্ট সমঝে চলেন।
বাড়িতে সমীরের খোঁজ নিতে তাদের অনেক আত্মীয় আসছে, তাদের সামনেও অনুরিমাকে বেরোতে দেয়া হচ্ছিলো না এই বলে যে স্বামীর অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকেই বৌ শয্যা নিয়েছে। অনুরিমার বাড়ির লোক আসতে চাইছিলো সমীরের এই দুর্দিনে পাশে দাঁড়াতে কিন্তু বাপের বাড়ির কাউকে কাননদেবী অ্যালাও করছিলোনা অনুরিমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে।
একাকী অনুরিমা
এদিকে অনুরিমার জীবন চরম অবহেলায় যেন নরকে পরিণত হচ্ছিলো। তার আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছিলোনা। তবুও সে মনে মনে নিজের স্বামীর সুস্থতার কামনা করে যাচ্ছিলো। নিজেকেই দায়ী করছিলো সমীরের অ্যাক্সিডেন্টের জন্য। ভাবছিলো সে এই শাস্তিটা সত্যি ডিজার্ভ করে শাশুড়ির থেকে।
এভাবেই কেটে যায় কয়েকদিন। সমীর অবশেষে ছাড়া পায় হাসপাতাল থেকে। ডাক্তাররা বলেন যে আপাতত সমীরের পক্ষে নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব হবেনা। সে সাময়িকভাবে পঙ্গু হয়েগেছে। খবরটা যেন মাথার উপর বাজ পড়ার মতো আসে মল্লিকবাড়িতে। হাসপাতালে থাকা যাবৎ এত টাকার বিল, ওষুধপত্রের এত খরচ, এরপর গোদের উপর বিষফোঁড়া সমীরের চাকরি চলে যাওয়া ওর পঙ্গুত্বের কারণে।
চরম আর্থিক অনটন নেমে এলো মল্লিকবাড়িতে। বাড়ি ফিরে সমীর দেখে তার স্ত্রী বিহ্বল হয়েগেছে তার দূর্ঘটনার ফলে। মনে মনে এইটুকুই স্বস্তি যে চাকরি চলে গেলেও বউটা অন্তত তারই রয়েছে, কোথাও যায়নি তাকে ছেড়ে, যে আশংকা সে হসপিটালে থাকাকালীন করে আসছিলো। কারণ হাসপাতালে তাকে দেখতে সবাই এসেছিলো, শুধু তার সবচেয়ে আপন মানুষটা ছাড়া।

বাবা ব্রজমোহন বাবুকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেছিলেন যে তার মা তার স্ত্রীকে দণ্ডিত করেছে সঠিক সময় পত্নী ধ’র্ম পালন না করতে পারায়। সেই শুনে সমীর আরোই বিচলিত ও চিন্তিত হয়ে ওঠে অনুরিমার জন্য। মনে মনে ভাবে এত যাতনা সইতে না পেরে অনুরিমা তাকে ছেড়ে চলে যাবেনা তো? এখন তো তার যাওয়ার জায়গার অভাব নেই। সে-ই জানে সে এতদিন যাবৎ নিজের ফ্যান্টাসি পূরণের জন্য অনুরিমাকে কতোটা যন্ত্রণা দিয়েছে। এখন যদি তার মাও তাকে অন্যভাবে যন্ত্রণা দেয় তাহলে হয় মৃত্যু বা সংসার ত্যাগ ছাড়া অন্য কোনো পথ অনুরিমার জন্য খোলা থাকবে না।
বয়কট অনুরিমা??
সবাই তো শুধু অনুরিমার দোষটাই দেখছে যে কেন সে আপৎকালীন সময়ে ফোনটা ধরেনি! কিন্তু কেউ তো জানেই না এরকম একটা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে অনুরিমার unavailable থাকার পিছনে মূল কান্ডারি ছিল দূর্ঘটনা কবলিত তাদের ছেলে সমীরই। সমীর এটা বুঝছিলো বলেই অনুরিমাকে অত যন্ত্রণা দিতে বারণ করছিলো নিজের বাবা মা কে। বাবা মেনে নিলেও, মা নাছোড়বান্দা ছিল এবিষয়ে। সমীর জেদ করলেও বউমাকে কাননবালা তার ছেলের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি যতদিন সে হসপিটালে ভর্তি ছিল।
বাড়ি ফিরে সমীর অনুরিমার সাথে সবকথা খুলে বলে, তার আশা আশংকা ভালোবাসার কথা। হাত জোর করে ক্ষমা চেয়ে নেয় নিজের স্ত্রীয়ের থেকে, তার ফ্যান্টাসির কল্পনা তার স্ত্রীয়ের যন্ত্রণার কারণ হয়ে ওঠায়। অনুরিমাও সমীরের সামনে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা চেয়ে নেয় তার ব্যাভিচারিতার জন্য। সে সকল কথা কনফেস করে সমীরের সামনে। নাহঃ, শুধু রাকিবের সাথে হওয়া ঘটনাসমূহ নয়, সুচরিতার প্রাক্তন স্বামী আদিত্য সেনগুপ্তর সাথে ঘটা বৃষ্টি ভেজা পড়ন্ত বিকেলের মিলনের কথাও।
সেদিন পড়ন্ত বিকেলে বৃষ্টিভেজা পরিবেশে একান্তে অনুরিমা ও আদিত্য
সেই অজানা ঘটনার কথা শুনে তো সমীরের চক্ষু চড়কগাছ! ভেবেই তার বুক কেঁপে উঠলো যে তার অনুরিমা তার ব্যতীত শুধু একজন নয় বরং দুজন পুরুষের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে। আর কাছাকাছি এসেছে আরো একজনের, ডাক্তার রাজীব! তার সাথে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পার্কে বা মানি স্কোয়ারের পিভিআর সিনেমা হলে রিহার্সালের নামে হওয়া সেই মেক আউট, অনুরিমার কাছে আসা, সেগুলোও সমীর ভুলবে কি করে!
প্রাথমিক ভাবে আদিত্যর বিষয়টা শুনে সমীর খুব ভেঙে পড়েছিল। কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি তার স্ত্রী তার ফ্যান্টাসি পূরণের জন্য এতদূর এগিয়ে যাবে। কিছুটা মনক্ষুন্ন হয়েছিল তার অনুরিমার উপর। কিন্তু অনুরিমা হাল না ছেড়ে বারংবার তাকে বোঝাতে থাকে যে সেসব শুধু সমীরের ইচ্ছেপূরণের একটা ধাপ হিসেবে দেখে সুচরিতার স্বামীর সাথে সে মিলনে লিপ্ত হয়েছিল। আরো বলে সে চাইলে এই বিষয়টা সমীরের থেকে আড়াল করে যেতে পারতো কিন্তু তা সে করেনি। কারণ সে এখন চায় সমীরের সাথে সবটা নতুন করে শুরু করতে। আর তাই পুরোনো সব পাপের কথা কবুল করে ক্ষমা চেয়ে তবেই সে পূনরায় আদর্শ পত্নী হয়ে উঠতে চায়।
নতুন স্বপ্ন চোখে মেখে…..
অনুরিমা তার আত্মপক্ষ সমর্থনে উদাহরণ দিয়ে নিজের স্বামীর সমীরকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলো তার করা সকল ব্যভিচারের কারণ ও উদ্দেশ্য। সে সমীরকে বোঝাতে চাইলো যে বিভিন্ন কারণে এক পবিত্র নারীর একাধিক পুরুষের সাথে সঙ্গমের উদাহরণ সেই মহাভারত কাল থেকে এই পবিত্র ভূমি দেখে এসেছে।
প্রথম উদাহরণ ধীবর কন্যা সত্যবতী, হস্তিনাপুর অধীশ রাজা শান্তনুর জায়া। যিনি রাজা শান্তনু সাথে বিবাহপূর্বক পরাশর নামক এক ঋষির সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হন, এবং তাদের একটি পুত্র হয় বেদব্যাস নামে যিনি পরবর্তীতে এই মহাভারতের ঘটনাসমূহকে লিপিবদ্ধ করে এক মহাকাব্যের রচয়িতা হন।
দ্বিতীয় উদাহরণ সেই কুরু বংশেরই আরেক রানীর, যাকে আমরা মাতা কুন্তী বলে চিনি। যিনি তার স্বামীর পিতামহীর মতোই আইবুড়ো কালে মা হয়েছিলেন। সূর্যদেবের সংস্পর্শে এসে কর্ণের জন্ম দিয়েছিলেন কুন্তী।
আর তৃতীয় উদাহরণ কুন্তীর পুত্রবধূ দ্রৌপদী, যিনি কুন্তীর আদেশেই কুন্তীর পাঁচ সন্তান কে বিবাহ করেছিলেন। এখন কথা হচ্ছে আমি এই তিনজনের নামই কেন নিলাম। কারণ এই তিন জন নারী একাধিক পুরুষের সাথে সহবাসের পরেও পবিত্র এবং কুমারীত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
কুমারী সত্যবতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে যখন ঋষি পরাশর তার সাথে সহবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন তখন প্রাথমিকভাবে সত্যবতী রাজি হননি। কিন্তু ঋষি পরাশর তাকে বরদান করেন যে তাঁর সাথে মিলনের পরেও সত্যবতীর কুমারীত্ব অক্ষুন্ন থাকবে। পরবর্তীতে তাদের মিলনে জন্ম নেন মহাভারতের রচয়িতা বেদব্যাস।
দ্বিতীয় ঘটনায় কুন্তীর সেবায় তুষ্ট হয়ে দুর্বাসা মুনি তাকে বরদান করেন যে তিনি যেকোনো দেবতার সাথে মিলিত হয়ে পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে পারবেন, তাতে তাঁর কুমারীত্ব হরণ হবেনা। এর ফলপ্রসূত তিনি বিবাহের পূর্বে সূর্যদেবের সন্তানের মা হন, এবং কর্ণের মতো এক বীরযোদ্ধার জন্ম দেন।
তৃতীয়ত কুন্তীর পাঁচ সন্তান অর্থাৎ পঞ্চ পান্ডবকে বিবাহের পর দ্রৌপদীর সতীত্ব রক্ষার জন্য নিয়ম করা হয় যে তিনি প্রত্যেক স্বামীর সাথে বারো বৎসর কাল দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করবেন, আর সেই সময়কালে তার অপর চার স্বামী তাঁর থেকে দূরে থাকবেন, এবং প্রতি বারো বৎসরের দাম্পত্য কালের শেষে তিনি পূনরায় কুমারীত্ব লাভ করবেন। এইভাবে দ্রৌপদী তাঁর পাঁচ স্বামীর কাছেই সতী রূপে বিরাজ করেন।
এর থেকে প্রমাণিত হয় কোনো ব্যভিচারিতা যদি কোনো কারণহেতু, বা মহৎ উদ্দেশ্য স্থাপনে, বা নিজ কর্তব্যের খাতিরে করা হয়, তাহলে তাকে ব্যভিচারিতা বলেনা, এবং পত্নীকেও ব্যভিচারিণী বলা যায় না। অনুরিমা আদিত্যর সাথে মিলিত হয়েছিল সমীরের ফ্যান্টাসি পূরণের প্রক্রিয়ার অনুশীলন হেতু। তার স্বামী যদি এধরণের নিয়মবিরুদ্ধ কল্পনা মনে পোষণ না করতো তাহলে অনুরিমার মতো পতিব্রতা স্ত্রীকে পরপুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার জন্য ছুটে যেতে হতোনা, তা সে আদিত্য হোক বা রাকিব, বা রাজীবের সাথে চুম্বনের আদান প্রদান। অতএব অনুরিমা ব্যভিচারিণী নয়, সে সমীরকে ঠকায়নি।
অনুরিমার এত যুক্তি শুনে সমীরও খানিকটা নিজের মনকে শান্ত করে। অনুরিমা বারবার তাকে অনুরোধ করে যে সামনে অনেক ঝড়ঝাপটা আসতে চলেছে। সমীরের চাকরি নেই, তিন্নির পড়াশুনা রয়েছে, শশুরমশাই এর পেনশনে গোটা পরিবার চলতে পারবে না। তাই এখন সব মান-অভিমান মুছে, অতীতে হওয়া সকল অনভিপ্রেত ঘটনা ভুলে সামনের দিকে তাকাতে হবে। আবার নতুন করে সবটা শুরু করতে হবে, ঠিক যেমন আগেকার সমীর অনুরিমা, যাদের জীবনে আর কোনো তৃতীয় ব্যক্তি থাকবে না, না আদিত্য না রাকিব না অন্য কেউ। এই বলে সে সমীরের সামনেই রাকিবের নম্বরটা ডিলিট করে ব্লক করে দিলো, কিন্তু মন থেকে কি করতে পারলো? তা স্বয়ং ঈ’শ্বরই জানেন।
সমীর-অনুরিমা
নতুন করে জীবন চলার পণ নিলো সমীর অনুরিমা, তবে তারা কি সফল হবে? নাকি অনুরিমার অতীত কালো ছায়ার মতো তার সাথে কোনো না কোনো ভাবে জুড়ে থাকবে?
জানতে হলে পড়তে থাকুন এবং অপেক্ষা করুন স্বামীর কল্পনা স্ত্রীয়ের যন্ত্রণার আগামী পর্বসমূহের। ……
নিজের মূল্যবান মতামত দিয়ে জ্ঞানের আলোয় থ্রেডটিকে আরো আলোকিত করে তুলুন এই আশাই লেখিকা হিসেবে পাঠকদের কাছে করি। ধন্যবাদ!……
সমীরের চাকরি গ্যাছে বহুদিন হলো। ডাক্তারের পরামর্শে যদিও সে সুস্থ হয়ে উঠছে তবে এখনও নিজের পায়ে জোর দিয়ে দাঁড়াতে পারেনা। এদিকে জমানো টাকা প্রায় শেষের পথে। বলেনা কলসির জল গড়াতে গড়াতে একসময় শেষ হয়ে আসে। অভিজাত মল্লিকবাড়ির অবস্থা সেরকম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনুরিমা ভাবলো এই মুহূর্তে তাকেই হাল ধরতে হবে। সমীরের সুস্থ হওয়ার অপেক্ষায় আর বসে থাকলে চলবে না।
অনুরিমাও যথেষ্ট শিক্ষিত ছিল, তাই চেষ্টা করলে কোনো একটা কিছু জোগাড় হয়ে যাওয়ার আশা থাকেই। প্রাথমিকভাবে সমীর কিছুটা আপত্তি জানালেও সে জানতো আর কোনো উপায়ও তো নেই। বাবা মা বুড়ো হয়েছে, তিন্নি বড়ো হচ্ছে, তার নিজের চিকিৎসার খরচাও রয়েছে। বাঁধা দেবেই বা কোন জোরে? Fragile masculinity দিয়ে তো আর সংসার চলবে না।
সমীর ও অনুরিমা – সমীনু
অনুরিমা সেইমতো বাড়ির গুরুজনেদের থেকে অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল চাকরির খোঁজে। অনেক জায়গায় চেষ্টা করলো, কিন্তু সবাই চায় কম বয়সী ফ্রেশার্স বা এক্সপিরিয়েন্সড কাউকে। ত্রিশোর্ধ অনুরিমার না ছিল যৌবনকালের বয়স না ছিল ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্সড। তাহলে সে যাবে কোথায়? অগত্যা মনে পড়লো তার বান্ধবীর কথা, সুচরিতা। সে সুচরিতার সাথে যোগাযোগ করলো। দুজনে একদিন একটা ক্যাফেতে দেখা করলো। অনুরিমা সুচরিতাকে খুলে বললো সব কথা। সেসব শুনে সুচরিতা তখন তাকে আদিত্যর সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলো।
সুচরিতা অনুরিমাকে জানায় যে আদিত্য এখন সেক্টর ফাইভের একটা বড়ো কোম্পানিতে as an executive manager হিসেবে জয়েন করেছে। আইটি সেক্টরে কাজ করার দরুন আদিত্যর অনেক জানা শোনা থাকতে পারে। সুচরিতার স্থির বিশ্বাস তার এক্স নিশ্চই অনুরিমার কোনো সাহায্য করে দিতে পারবে। হয়তো সে নিজের কোম্পানিতেই অনুরিমাকে হায়ার করে নেবে।
কিন্তু শেষমেশ সেই আদিত্য সেনগুপ্ত? যার সাথে কবেই অনুরিমা যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে, সেই দূর্ঘটনাময় ঘনিষ্ঠতাক ভুলে যাওয়ার জন্য। তার কাছে কি করে যাবে সে? খুব স্বার্থপর লাগবে তাকে। তাই অনুরিমা সুচরিতাকে অনুরোধ করতে লাগলো তাকে অন্য কোথাও কাজের খোঁজ দিতে। সুচরিতা বুঝতে পারছিলোনা কেন অনুরিমার এত আপত্তি আদিত্যর থেকে হেল্প নিতে? আসলে কয়েকমাস আগে ঘটে যাওয়া অনুরিমার ও আদিত্যর মধ্যেকার সেই দূর্বল মুহূর্তগুলোর কথা সুচরিতা জানতো না। না আদিত্য তাকে বলেছিলো আর না অনুরিমার বলার কোনো প্রশ্ন ছিল।
অনুরিমা ও আদিত্য
সুচরিতা অনুরিমাকে পারসিস্ট করতে লাগলো আদিত্যর কাছে যাওয়ার জন্য চাকরির কারণে। সে তার বান্ধবীকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলো তার কাছে আর কোনো আইডিয়া নেই আদিত্যর কাছে অনুরিমাকে পাঠানোর ছাড়া। এতে না পোষালে সুচরিতার আর কোনো কিছু করার নেই। সে নিজে যেখানে কাজ করে সেখানে তার অতো জোর খাটেনা। সুচরিতা নিজেই তার চাকরি বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, তাহলে সে কি করে অনুরিমার কোনো ব্যবস্থা করে দেবে নিজের অফিসে?
অফিস থিয়েটার দু’দিক সামলাতে গিয়ে সুচরিতা হিমশিম খাচ্ছে। তাই অফিসের কাজে গাফিলতিও হচ্ছে তার দ্বারা। সুতরাং সুচরিতার এখন প্রধান লক্ষ্য অফিসের তার ঠারকি বসের মন জুগিয়ে চলা। নাহঃ, শরীরের চুক্তি করতে হয়না, তবে একপ্রকার অফিসের টেম্পোরারি বউ হয়ে সব খেয়াল রাখতে হয় তাকে। যেমন সময়ে সময়ে বসের মুখের সামনে সিগারেট, চা ধরিয়ে দেওয়া, কখনো সখনো মাথা টিপে দেওয়া, বাইরে কোথাও থেকে মিটিং সেরে অফিসে এলে আদর করে স্যারের কপালের ঘাম মুছিয়ে দেওয়া।
হায় রে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওমেন, সংসার ছেড়ে মুক্তির খোঁজে কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে আসা তোমার স্বাধীনতা কত আপোষের মধ্যে দিয়ে নিজেকে উদযাপন করে। সুচরিতা চায়না, তার বসের কাছে অনুরিমার নাম সুপারিশ করে ওকে এই নর্দমায় টেনে আনতে। নো ডাউট অনুরিমা তার থেকে অনেক অনেক বেশি সুন্দরী, তাকে দেখলে তার ওড়িয়া বস জিতিন মহাপাত্র স্যার আরো বেশি এক্সপ্লইটেটিভ হয়ে যাবে, অনুরিমার মতো নরম স্বভাবের মেয়ে সেই এক্সপ্লয়টেশন নিতে পারবেনা।
তুলনামূলক ভাবে আদিত্যর কাছে পাঠালে অনুরিমা বেশি সিকিউরড্ থাকবে। যদিও সব কর্পোরেট অফিসেই মোর ওর লেস মেয়েদের একই হাল, তবু আদিত্য থাকায় অনুরিমা যথেষ্ট ভরসা পাবে। যতই হোক, তার প্রাক্তন স্বামী মানুষ হিসেবে যে খুব ভালো। আচ্ছা তাহলে কি সে নিজে আদিত্যর কাছে যেতে পারতো না? ওর অফিসেই চাকরি করতে পারতো না? নাহঃ! কারণ একদিন যে স্বাধীনতার খোঁজে সুচরিতা নিজের পরিচয় নিজে তৈরী করার তাগিদে আদিত্যর ঘর ছেড়েছিলো, তারই কাছে ফের আশ্রয় চাইতে যাবে কোন মুখে? তাহলে তো সেটা একপ্রকার পরাজয় যা সুচরিতার জাত্যাভিমান কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না।
সুচরিতা থিয়েটারও করে, কিন্তু সেখানে সে অনুরিমার জন্য কিই বা চাকরির ব্যবস্থা করবে? হ্যাঁ, যদি বলতো সে অভিনয় করতে চায়, তাহলে একবাক্যেই তার রূপ দেখে টলিপাড়ার ডিরেক্টররা তাকে কাস্ট করে নিতো। কিন্তু অনুরিমার শশুরবাড়ি যা গোঁড়া তাতে তারা না খেতে পেয়ে মরে যাবে কিন্তু নিজের বাড়ির বউকে সিনেমাতে নামাবে না।
অনুরিমা বসু মল্লিক
তাই সুচরিতা অনুরিমাকে বুঝিয়ে বললো, “দেখ অনু, আমার কথাটা প্লিজ শোন্। আমি আদিত্যকে বলছি, তুই ওর অফিসে গিয়ে দেখা কর। ও নিশ্চই তোর একটা ব্যবস্থা করে দেবে। এর থেকে ভালো উপায় আর কিচ্ছু হয়না। আমার প্রাক্তন হয়েও বলছি, আদিত্য সত্যিই খুব ভালো ছেলে।” “কিন্তু ওর কাছে কি মুখ নিয়ে দাঁড়াবো আমি? আমি তো…..”, বলেই অনুরিমা থেমে গেলো।
“আমি তো…. কি?”
“কিছুনা….. আসলে আমি তো ওর সাথে কোনো যোগাযোগ রাখিনি। ও মাঝে মাঝেই আমাকে ফেসবুকে ম্যাসেজ করতো, নরম্যাল ম্যাসেজ। কিন্তু আমি কোনো রিপ্লাই করতাম না। তাই সেও যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলো। এখন যদি ওর কাছেই চাকরি চাইতে যাই তাহলে ব্যাপারটা কিরকম দেখায় না! ও কি ভাববে, কতটা স্বার্থপর মহিলা আমি। আজ দরকারে ওর কাছে এসছি, তখন পাত্তাও দিইনি। …..”
আংশিক সত্যি বলে থামলো অনুরিমা। যোগাযোগ তো বন্ধ ছিল কিন্তু তার কারণ ছিল অন্য। সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের মনোরম মিলনকে অনুরিমা নিজের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলো। তাই আদিত্যকে যোগাযোগ রাখতে বারণ করেছিলো। এখন তারই মুখাপেক্ষী হতে হবে অনুরিমাকে?? শুধু যে স্বার্থপর লাগবে নিজেকে সেই কারণে নয়, আবার যদি আদিত্যর সামনে সে কোনো এক দূর্বল মুহূর্তে দূর্বল হয়ে গিয়ে অঘটন ঘটিয়ে ফেলে, সেই ভয়টাও সমানভাবে অনুরিমার মনে কাজ করছিলো। সে যে সমীরকে কথা দিয়েছে, পুরোনো সবকিছু ভুলে তারা নতুন করে জীবন শুরু করবে, যেখানে আদিত্য, ডাক্তার রাজীব বা রাকিব কেউই থাকবে না, তাহলে ফের কেন ভাগ্য তাকে সেই তিনপুরুষের মধ্যে এক পুরুষের কাছে আবার ফিরিয়ে আনছে? কেন?
আদিত্য + অনুরিমা = আদিনু
এসব কিছু থেকে অজ্ঞাত সুচরিতা অনুরিমাকে বলতে লাগলো যে আদিত্য অত কুটিল মানসিকতার ছেলেই নয়। আদিত্য জানে অনুরিমা বিবাহিতা, ফলে ওর পক্ষে অন্য কোনো পুরুষের সাথে খাঁটি বন্ধুত্ত্ব রাখাও দুস্কর! সুচরিতা নিশ্চিত ছিল যে আদিত্য পুরো বিষয়টাকে সেভাবে দেখবেই না যেভাবে অনুরিমা কল্পনা করছে। অনুরিমাকে স্বার্থপর ভাববে না সে।
অনুরিমাকে সুচরিতা আরো জানায় যে অনুরিমা তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পরও তাদের মধ্যে অনুরিমাকে নিয়ে প্রায়ই কথা হতো।….. অনুরিমা অবাক পানে সুচরিতার দিকে চেয়ে জানতে চাইলো কি এমন কথা হতো তাকে নিয়ে?
উত্তরে সুচরিতা বললো, “এমনিই, কোনো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে নয়। Actually Aditya was concerned for you because of Somir’s fantasy…. তাই মাঝে মাঝেই তোর হাল-হকিকত জানতে চাইতো। আমি বলতাম ওর মতো আমার সাথেও তুই আর যোগাযোগ রাখিস না। ডক্টর রাজীবের সাথে কনসাল্ট করাও ছেড়ে দিয়েছিস। শেষবার তোর বলা কথাগুলো অনুযায়ী you and Somir overcome that situation and Somir was starting to focus on the married life by forgetting his fantasy.. আমিও তাই সেইসব বিষয় নিয়ে তোকে আর বেশি ঘাটাইনি। If everything was ok between you and your husband, then why I need to bother…. তারপরও আদিত্য তোর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো কিন্তু কোনো সদুত্তর পেতোনা আমার কাছ থেকে, কারণ আমার কাছে তোকে নিয়ে আর কোনো প্রপার ইনফরমেশন থাকতো না।..যদিও ও ইনসিস্ট করতো আমাকে তোর খোঁজ নেওয়ার জন্য কিন্তু আমি অপেক্ষা করছিলাম আবার তোর থেকে প্রথম কলটা আসার।.. বাট আমি বুঝতে পারিনি এরই মধ্যে তোর জীবনে এত প্রবলেম এসে যাবে, সমীরের অ্যাক্সিডেন্ট, ওর জব চলে যাওয়া, তোদের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস। তুই তো আরো আগে যোগাযোগ করতে পারতিস রে।….”
“সরি রে, আমার কোনো উপায় ছিলোনা। সমীরের অ্যাক্সিডেন্ট এর পর আমি আমার শশুরবাড়িতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলাম। বিশেষ করে আমার শাশুড়ি মা আমার উপর literally মানসিক নির্যাতন করা শুরু করেছিলো। কারণ নাকি আমিই দায়ী এসব কিছুর জন্য। এখন অনেক দিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে তোর সাথে দেখা করতে পেরেছি।”
“এইজন্যই মাঝে মাঝে মনে হয়, ডিভোর্স দেওয়াটা আমার জীবনের বেস্ট ডিসিশন ছিল। বিশেষ করে যখন তোকে দেখি…..”
“কিন্তু সমীর কোনো দোষারোপ করেনি। সে যতটা সম্ভব আমাকে সাপোর্ট করেছে।”
“সে তো আমার সংসারে আমার স্বামী আদিত্যর মধ্যেও কোনো সমস্যা ছিলোনা, he is still a gem.. কিন্তু আমাদের মেয়েদের ক্ষেত্রে সংসার তো শুধু স্বামীকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়না। পারিপার্শ্বিক মানুষ গুলো যদি ঠিক না থাকে তাহলে সংসার টিকিয়ে রাখা খুব মুশকিল।”
“তো তুই কি বলতে চাইছিস, এই খারাপ সময়ে আমি সমীরকে ছেড়ে চলে যাবো জাস্ট বিকজ আমার শাশুড়ি মা আমার সাথে ভালো ব্যবহার করেনা তাই!!”
“নাহঃ, আমি শুধু বলছি be a girl of your own terms.. এখন সংসারটা তোর উপর নির্ভরশীল। তাই অন্য আর কারোর ক্ষেত্রে না হলেও অন্তত নিজের ব্যাপারের সব সিদ্ধান্ত নিজে নিবি, কাউকে ইন্টারফেয়ার করতে দিবিনা। কোথায় চাকরি করবি, কি চাকরি করবি সেটা ঠিক করার অধিকার শুধু তোর, তুই চাইলে আমার সাথে থিয়েটারও করতে পারিস। তুই দেখতে খুব সুন্দরী, থিয়েটার করতে করতে কোনো পরিচালকের নজরে চলে এলে ভালো অভিনেত্রীও হতে পারিস।….”
“অভিনেত্রী, তাও আবার আমি?? পাগল!!”
“আমার যেটা ভালো মনে হলো আমি বললাম, বাকি তোর ডিসিশন।”
“হুমঃ!…. আচ্ছা আর কি কিছু কথা হতো তোর আর আদিত্যর মধ্যে, আমাকে নিয়ে? তুই আমাকে নির্দ্বিধায়ে বলতে পারিস।….”
“নাহঃ, কিন্তু তুই এত টেন্সড হয়ে জিজ্ঞেস করছিস কেন? হ্যাঁ রে, তোর আর আদিত্যর মধ্যে কি কোনো সিক্রেট আছে যেটা তুই চাইছিসনা আমি জেনে ফেলি? হি হি হি হি….”
মজার ছলে হলেও সুচরিতা সঠিক কথা বলেছিলো। আর সত্যিই অনুরিমাকে সেইজন্যই টেন্সড দেখাচ্ছিলো, পাছে তার বান্ধবীকে আদিত্য সব বলে দেয়নি তো! কিন্তু না, সুচরিতার মজা করার ছলে কথাটা বলার ভঙ্গি দেখে অনুরিমা বুঝলো সত্যিই সুচরিতা কিছু জানেনা। সে আদিত্যর সাথে যোগাযোগ ভঙ্গ করলেও আদিত্য তার বিশ্বাস ভাঙেনি।
তবু সে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে সুচরিতার কথা বিরক্তির সাথে উড়িয়ে বললো, “ধ্যাৎ! তোর না সব বিষয়ে খালি মজা করার স্বভাব। দেখছিস আমি কিরকম বিপদে রয়েছি, তাতেও তুই মজা করার একটাও সুযোগ ছাড়িস না।”
অনুরিমাকে কারণে-অকারণে ঘাবড়ে যেতে দেখলেই সুচরিতার মজা করার প্রবণতা দ্বিগুন বেড়ে যায়, সেই কলেজ জীবন থেকেই। তা যতই পরিস্থিতি প্রতিকুল হোক না কেন।…..
“আরে আমি তো শুধু তোর মুডটা লাইট করার জন্য মজা করে থাকি। তুই তো জানিস আমার নেচার। আমার এই প্রিয় বান্ধবীটাকে সময়ে অসময়ে উত্যক্ত করতে আমার বেশ ভালোই লাগে। বাই দা ওয়ে, তুই চাইলে আদিত্যর সাথে প্রেম করতেই পারিস, আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। এমনিতেও সে তোর নামে অর্ধেক জল বেশি খায়!”
“মানে?”
“মানে হলো, তুই যোগাযোগ না রাখলেও আদিত্য তোর প্রশংসা করে করে হাঁপায়না। কি যে জাদু করেছিস ওর উপর কে জানে! তাই তো বলছি ওকে বললে তোর সব প্রবলেম তুড়ি মেরে সল্ভ হয়ে যাবে। He is literally your biggest admirer, তাই এই সুযোগটা কে কাজে লাগা।”
“আমি ওরকম সুযোগসন্ধানী হতে পারবো না।”
“আরে আমি কি তোকে আদিত্যকে এক্সপ্লয়েট বা ওর ভালোমানুষির ফায়দা তোলার কথা বলছি? আমি শুধু বলছি যে তোকে আমি আদিত্যর সাথে আবার কন্ট্যাক্ট করিয়ে দেব। ওকে বললে ও তখন তোর জন্য ভালো একটা চাকরি জোগাড় করে দেবে। তুই মন দিয়ে চাকরি করে সংসারের জন্য টাকা রোজগার করবি, তোর সব দুঃখ, অভাব-অনটন কেটে যাবে। ব্যাস! এতে সুযোগসন্ধানী হওয়ার কি আছে? তুই না প্রয়োজনের থেকে বড্ডবেশি ভালোমানুষী দেখাস। এখন তোর কাছে সবচেয়ে বেশি কি প্রায়োরিটি হওয়া দরকার, তোর সো কল্ড আত্মসম্মানবোধ নাকি তোর পরিবারের ভবিষ্যৎ?…….”
সুচরিতার কথামতো অনুরিমা ঠিক করলো একদিন চাকরির উদ্দেশ্যে আদিত্যর অফিসে গিয়ে দেখা করবে তার সাথে। অনুরিমার থেকে সম্মতি পেয়ে সুচরিতা আদিত্যকে জানায় এবং একটি অ্যাপয়েনমেন্ট তাদের মধ্যে ফিক্স করে। সেইমতো নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট সময়ে অনুরিমা আদিত্যর অফিসে গিয়ে পৌঁছয়। সেক্টর ফাইভের ওয়েবেল মোরে এক বিশাল অফিস টাওয়ারে আদিত্যর পসার।
অফিস বিল্ডিং-এর সামনে এসে সিকিউরিটি কিয়স্কে ঠিকানা লেখা কাগজটা দেখানোয় সিকিউরিটি পার্সোনেল অনুরিমাকে বললো তার গন্তব্য Seventh floor-এ। লিফট দিয়ে উঠে এলো অনুরিমা। কাঁচের দরজা খুলে ঢুকে সামনের দিকে এগোতেই অফিসের এনকোয়েরি ডেস্ক থেকে একজন মহিলা নিজের সিট্ থেকে উঠে জিজ্ঞেস করলো, “কোথায় যাচ্ছেন ম্যাম?”
“আমি…. আদিত্য সেনগুপ্তর সাথে দেখা করবো। ওনার সাথে অ্যাপয়েনমেন্ট আছে”
“আপনার নাম?”
“অনুরিমা বসু মল্লিক…..”
“একটু ওয়েট করুন”, বলে ডেস্কের মহিলাটি টেলিফোনের রিসিভারটা হাতে নিয়ে কানে ধরলো। দুটো বাটন প্রেস করে অপেক্ষা করতে লাগলো অপর প্রান্ত থেকে রেসপন্স আসার।……
“হ্যাঁ স্যার, একজন অনুরিমা বসু মল্লিক নামের ভদ্রমহিলা বলছেন তার সাথে নাকি আদিত্য স্যারের অ্যাপয়েনমেন্ট রয়েছে”
অপর প্রান্ত থেকে একটি মধ্যবয়সী লোকের গলা ভেসে আসলো, “ঠিক আছে একটু ওয়েট করো, আমি চেক করে জানাচ্ছি”, বলে ফোনটা রেখে দিলো।
ফোন কাটার পর ডেস্কে বসা মহিলাটি অনুরিমাকে কিছুক্ষণ বসতে বললো। অনুরিমা ভাবলো আদিত্য এত বড়ো অফিসে চাকরি করে! তাও আবার এত বড়ো পোস্টে, যে ওর সাথে দেখা করতে গেলে এত ফর্মালিটিস করে এত এমপ্লয়িকে জানিয়ে যেতে হয়!
আসলে অনুরিমার কোনো ধারণা ছিলোনা আইটি সেক্টরে কাজ কিভাবে হয়, কিরকম সেখানকার ওয়ার্কিং এনভায়রনমেন্ট। এসব সম্পর্কে সে অবগত ছিলোনা। কারণ কলেজ পাশ করার পর সমীরের সাথে বিয়ে করে সমীরের ঘরণী হয়েই সে থেকে গেছিলো। আর সেইভাবেই থাকতে চেয়েওছিলো। সুচরিতার মতো সংসার ছেড়ে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওমেন হওয়ার শখ তার কোনোকালেই ছিলোনা। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস দেখুন, আজ তাকে সেই ঘর থেকে বেরোতে হলো, ঘরকে রক্ষা করার জন্যই।
অনুরিমা নিজের জীবন নিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন ছিল। কিছুক্ষণ পর এনকোয়েরি ডেস্ক থেকে অনুরিমাকে জানালো হলো যে তার অ্যাপয়েনমেন্ট কন্ফার্ম করা হয়েছে, এবার সে ভেতরে যেতে পারে। এনকোয়েরি ডেস্কের মেয়েটি তাকে আদিত্যর কেবিনের রাস্তাটা দেখিয়ে দিলো। সেই দেখানো পথে হেঁটে অনুরিমা আদিত্যর কেবিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। মাঝবয়সী ভদ্রলোকটি যিনি ফোনের ওপার থেকে এনকোয়েরি ডেস্কে ইন্সট্রাকশন দিয়ে থাকেন তিনি এগিয়ে এলেন অনুরিমাকে দেখে, “আপনি অনুরিমা বসু মল্লিক?”
“হ্যাঁ….”
“আপনি সব ডকুমেন্টস নিয়ে এসেছেন তো?”
“কিসের ডকুমেন্টস?”
“অ্যাপয়েনমেন্টের রিজন দেওয়া আছে ইন্টারভিউ অথচ কোনো ডকুমেন্টস নিয়ে আসেননি?”
“আমি আমার গ্রাজুয়েশনের সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছি”
“সেটাকেই তো ডকুমেন্টস বলে, এইটুকু জানেননা?”

অনুরিমা লজ্জায় চুপ করে রইলো। অনুরিমাকে থতমত খেতে দেখে লোকটি নিজের গলার স্বর নিচু করে বললো, “ঠিক আছে, যান ভেতরে, স্যার অপেক্ষা করছেন”, এই বলে লোকটি কেবিনের দরজাটি নিজে খুলে দিলো অনুরিমার জন্য।
অনুরিমা আদিত্যর কেবিনে ঢুকলো। তারপর কেবিনের দরজা বাইরে থেকে ভিজিয়ে দিয়ে লোকটা চলে গেলো। অনুরিমাকে দেখা মাত্রই আদিত্য নিজের সিট থেকে উঠে দাঁড়ালো। আদিত্যর মনে তখন শত-সহস্র ড্রাম একসাথে বাজছিলো। ইন্টারভিউ দিতে অনুরিমা এসছিল অথচ নার্ভাস ইন্টারভিউয়ার হচ্ছিলো।
অনুরিমাকে দেখে আদিত্য কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। কিছু সেকেন্ড বাদে ঘোর কাটার পর আদিত্য অনুরিমাকে বসতে অনুরোধ করলো। টেবিলের অপরপ্রান্তে থাকা দুটি সুইভেল চেয়ারের মধ্যে একটিকে টেনে অনুরিমা বসলো।
“সো,…. অনেকদিন পর দেখা হলো….”
“হুম….”
“কেমন আছো?”
“ভালো….”
“ভালো থাকলে তো এখানে আসতে না….”
অনুরিমা চুপ করে রইলো।…..
“ওকে, আগে বলো কি নেবে? চা, কফি নাকি ঠান্ডা?”
“আমি এখানে শুধু একটা জিনিসই নিতে এসছি, তা হলো চাকরি।….”
“স্মার্ট আনসার! এইজন্য আমার তোমাকে এত ভালো লাগে।.. অযথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করোনা তুমি। যা চাওয়ার তা পরিষ্কার জানিয়ে দাও। ঠিক যেমন কয়েকমাস আগে চেয়েছিলে আমি তোমার সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিই, আর সেটাও ঠিক এইভাবেই স্পষ্ট মুখের উপর বলে দিয়েছিলে আমাকে।…..”
“সেটা বলার পিছনে যথেষ্ট কারণ ছিল আদি।…. আমি চাইনি আমাদের মধ্যে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনাটার আবার কোনো পূনরাবৃত্তি ঘটুক, সেইজন্যই তোমার থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছিলাম। হয়তো তুমি আমাকে এখন খুব স্বার্থপর একটা মেয়ে ভাবছো যে ঠেলায় পড়ে তোমার কাছে ছুটে এসছে।…. আর সত্যি বলতে বিপদে না পড়লে আমি তোমার সাথে আর যোগাযোগ করতামও না। তার জন্য তুমি আমায় স্বার্থপর, লোভী মানুষ ভাবতেই পারো। আমার পরিবারকে বাঁচানোর জন্য আমি সকল রকমের গঞ্জনা সইতে রাজি আছি।”
আদিত্যর সাথে কাটানো অনুরিমার সেই দূর্বল মুহূর্ত
“তোমার সাথে কাটানো যে মুহূর্তগুলো-কে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি ভেবে আঁকড়ে বেঁচে আছি, সেইসব তোমার কাছে নিছক একটা দূর্ঘটনা ছাড়া আর কিচ্ছু নয়?”
“না, আর কিচ্ছু নয়…. তার জন্য যদি তুমি আমাকে চাকরি দিতে না চাও তবে তাই ভালো, কিন্তু আমি তোমাকে কোনো মিথ্যে আশা দিতে চাইনা আদিত্য। আমি যে আমার স্বামীকে কথা দিয়েছি…..”
“কি কথা?”
“কিছুনা…..”
অনুরিমা নিজেকে সংযত করে নিলো। সে বলতে চাইছিলো না যে সমীরের দূর্ঘটনার পর অনুরিমা স্বামীর কাছে তার সকল ব্যভিচারের কথা স্বীকার করে নেয়। ক্ষমা চেয়ে প্রতিশ্রুতি দেয় যে আর কোনোদিন অন্য কোনো পুরুষকে তার ধারের কাছে ঘেঁষতে দেবেনা! তাহলে কি শুধু প্রতিজ্ঞার কারণেই অনুরিমা আদিত্যর থেকে দূরে সরে থাকতে চায়? যদি সমীরের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হতো তাহলে কি করতো সে? ফের এক নিষিদ্ধ টানে অবৈধ পথে পা বাড়াতো? তবে কি অবচেতন মনে অনুরিমা চায় অন্য পুরুষসঙ্গ লাভ করতে? সমীরের থেকে অহেতুক মানসিক যাতনা পেয়ে পেয়ে কি সমীরের প্রতি তার ভালোবাসা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে? তাহলে কি আগের মতো সে আর সমীরকে ভালোবাসেনা? শুধুই স্ত্রী ও মাতৃ ধর্ম পালনেই সংসার করছে?
তাই যদি হয় তবে মনের টানে শরীরের তাড়নায় সাড়া দিতে ক্ষতি কি? কিন্তু না, সমীরকে সে কষ্ট দিতে চায়না? আগের মতো অতটা প্রবলভাবে না হলেও এখনও কিছুটা অনুভূতি নিজের দাম্পত্য জীবন নিয়ে রয়ে গ্যাছে অনুরিমার, সেই জন্যই নিজেকে সংযত রাখা তার পক্ষে খুব জরুরী।
আদিত্য বুঝলো প্রথমদিনেই অনুরিমাকে বেশি চাপ দিয়ে তার অন্তরের কথা জানাটা অনুচিত হবে। তার মনের কথা ধীরে ধীরে জেনে মনের ফাঁক-ফোঁকড়ে অল্প অল্প করে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে হবে। সেইদিনের বিকেলের পর থেকে আদিত্য নিজের মন অনুরিমাকে দিয়ে ফেলেছিলো। তার ধীর বিশ্বাস ছিল অনুরিমার প্রতি তার অনুভূতি খাঁটি হলে অনুরিমা নিজে একদিন তার কাছে আসবে। হলোও তাই! সাংসারিক অনটনের কারণে হলেও অনুরিমা তার স্মরণাপন্ন তো হয়েছে, এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করলে চলবে না, মনে মনে ভাবলো আদিত্য।
সেই অবিস্মরণীয় বিকেলে হোটেল রুমের বিছানায় শায়িত আদিত্য এবং অনুরিমা
“ঠিক আছে, তুমি নিজে থেকে নিজের জীবনের কথা শেয়ার করতে না চাইলে আমি তোমাকে জোর করবো না। তাছাড়া তুমি এখানে প্রফেশনাল রিজনে এসছো। আমি খামোখা কেনই বা তোমার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবো। তুমি তোমার স্বামীকে কি কথা দিয়েছো, আর তার জন্য কেনই বা আমাদের এই সুন্দর বন্ধুত্ব সম্পর্কটা যেটা আরো গাঢ় ও সুমধুর হতে পারতো সেটা হতে দাওনি, সেটা আর এখন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ এখানে আমি তোমার ভাবি বস, যদি তুমি চাকরিটা পাও। বন্ধু হিসেবে আমায় তুমি স্বীকার করলে না। দেখি তোমায় আমি আমার সেক্রেটারি হিসেবে স্বীকার, মানে নিয়োগ করতে পারি কিনা…..”
“আমার এই চাকরিটা খুব দরকার…. আমি অনেক জায়গা ঘুরেছি, কেউ বলছে ২৩-২৪ বছর বয়সী ফ্রেশার্স চায়, তো কেউ বলছে অভিজ্ঞ কাউকে চায়। আমার তো না আছে চব্বিশ বয়সী ফ্রেশার্স তকমা, না আছে কোনো অভিজ্ঞতা। আমি তাহলে কোথায় যাবো?”
“ঠিক আছে, তোমার গ্রাজুয়েশনের সার্টিফিকেটটা একটু দেখি….”
অনুরিমা ফাইল বার করে সেখান থেকে নিজের গ্রাজুয়েশনের সার্টিফিকেট এবং মার্ক শিট দুটোই আদিত্যর হাতে তুলে দিলো। আদিত্য সেই দুটো ডকুমেন্টস নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। অনুরিমা ফিজিক্স অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছিল। অনুরিমার মার্ক শিট দেখে তো আদিত্য অবাক!
“তুমি গ্রাজুয়েশনে ৭৪ পার্সেন্ট পেয়েছিলে তাও আবার ফিজিক্স (Physics) অনার্সে!! Unbelievable!! এত ব্রাইট রেজাল্ট নিয়েও তুমি এতদিন ঘরে বসেছিলে? মাস্টার্স-টাও করোনি?? কেন?”
“আসলে সমীর তখন চেয়েছিলো আমরা তাড়াতাড়ি বিয়েটা করে নিই। গ্রাজুয়েশনের পর সমীরও একটা ছোটখাটো চাকরি পেয়ে যায়, সেই সাথে সাথে সমীর নিজের মাস্টার্সটাও কমপ্লিট করতে লাগে। আমারও খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু শাশুড়ি মা করতে দেয়নি। একে তো লাভ ম্যারেজ, তাও আবার এত তাড়াতাড়ি।…. সমীরের মা এই বিয়েতে খুব একটা রাজি ছিলোনা প্রথমে, সেই কারণেই বিয়ের পর পর ওঁনার মুখের উপর সাহস করে বলতে পারিনি হায়ার স্টাডিজ করার ইচ্ছেটা…..”
“বাহঃ, আর সেই কারণে নিজের কেরিয়ারটা-কে জলাঞ্জলি দিয়ে তুমি শুধু সমীরের ঘরণী হয়ে থেকে গেলে!! আজ তোমার মাস্টার্সটা করা থাকলে তোমার যা রেজাল্ট তাতে চাকরি নিজে পায়ে হেঁটে তোমার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াতো, তখন তুমি ফ্রেশার্স না এক্সপিরিএন্সড সেটা কোনো ম্যাটার করতো না। সেই তো তারা তোমাকে চাকরি করতে ঘর থেকে বের করলো, তাহলে সমীরের মতো তোমাকে মাস্টার্স পড়তে পাঠালো না কেন?”
অনুরিমা মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো। অনুরিমার কিছু বলার ছিলনা। সত্যিই তো তার উপর এতদিন অন্যায় হয়েছে যেটা সে সমীরের ভালোবাসার দোহায় দিয়ে মুখ বুজে সহ্য করে গ্যাছে। অনুরিমাকে নিয়ে আদিত্যর আফসোস ভরা কথাগুলো যেন তীরের মতো অনুরিমার মনে গিয়ে বিঁধছিলো। তার চোখ দিয়ে দু’ফোটা জল বয়ে নামলো নরম গালে। তা দেখে আদিত্য নিজের চেয়ার থেকে উঠে অনুরিমার পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো তাকে শান্ত্বনা দেওয়ার জন্য।
ঠিক যেন রোম্যান্স মুডে আদিত্য-অনুরিমা……
অনুরিমার রেশমি চুলে আলতো হাত বুলিয়ে আদিত্য বললো, “এবার বুঝতে পারছো অনুরিমা, তুমি এতদিন সংসার করার নামে ভস্মে ঘি ঢেলে গেছো। কার জন্য এতটা স্যাক্রিফাইস করলে? সমীরের জন্য? সে আদেও তার দাম দিয়েছে? দিলে কি ও তোমাকে কাকোল্ড ফ্যান্টাসির মতো একটা নোংরা খেলায় নিমজ্জিত হতে ফোর্স করতো? একবার ভেবে দেখো…. আজকেও তুমি আমার কাছে চাকরি চাইতে এসছো ওই লোকটা এবং তার পরিবারকে এই কঠিন সময় থেকে উদ্ধার করার জন্য। চাকরির করার মূল উদ্দেশ্যই হলো তারা, নিজের কেরিয়ার তৈরি করার তাগিদ নয়।”
“কিন্তু সমীরকে যে আমি ভালোবাসি। আমার গোটা জীবন জুড়ে শুধু ও রয়েছে, ওই আমার পৃথিবী। আর ও তো নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে, ক্ষমাও চেয়েছে অনেকবার। তাই তো আমি সব ভুলে ওর জন্য নিজে চাকরি করতে বেরিয়েছি। আজ সমীর সুস্থ হয়েগেলে আমার আর চাকরি করার দরকারই পড়বে না।”
“See, this is your problem…. তোমার গোটা পৃথিবী জুড়েই শুধু সমীর বিরাজ করছে। অ্যাস্ ইফ আর কেউ যেন দুনিয়াতে এক্সিস্টই করেনা। তুমি একটু নিজের কথাও ভাবো। তুমি সমীরের দেখভাল করার জন্য চাকরি করবে। রোজগারের টাকা দিয়ে নিজের স্বামীর ভরণপোষণ চালাবে, চিকিৎসা করাবে। খুব ভালো কথা, একজন আদর্শ স্ত্রীয়ের পরিচয় দিচ্ছ তুমি। কিন্তু তাই বলে ভবিষ্যতে সমীর সুস্থ হয়ে গেলে চাকরি ছেড়ে দেবে, এ কিরকম কথা? আমার সামনে সৎ ভাবে বললে ঠিক আছে, কিন্তু অন্য কোথাও ইন্টারভিউতে এই কথা বললে তুমি তৎক্ষণাৎ রিজেক্ট হয়ে যেতে। কোনো কোম্পানিই এমন কাউকে নেবেনা যার ভিশনই শুধু সংসারকেন্দ্রিক, সেক্ষেত্রে তাকে সংসারেই থেকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে রিজেক্ট করে দেওয়া হয়। আইটি সেক্টরের ইন্টারভিউতে একটা কমন প্রশ্ন থাকে সেটা কিই জানো?”
“না, কিই?”
“প্রশ্নটা হলো — Where will you see yourself in five years?.. কেন জিজ্ঞেস করা হয়, জানো?”
“না….”
“এটা দেখার জন্য যে অ্যাপ্লিকেন্ট কতটা ভিশনারি নিজের কেরিয়ার নিয়ে…. আর তুমি যদি এরকম উত্তর দাও যে আমার স্বামী সুস্থ হয়ে গেলেই আমি চাকরি ছেড়ে দেবো, আর পাঁচ বছর পর আমি ফের নিজেকে গৃহবধূর ভূমিকায় দেখতে চাই, তাহলে তক্ষুনি সেই উত্তর শুনে ইন্টারভিউ প্যানেল তোমাকে হাতে ফ্রাইং প্যান ধরিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে….”
মজার ছলে শেষ বাক্যটি বলায় অনুরিমা হেসে ফেললো। আদিত্য সেইসময়ে বেখেয়ালী হয়ে থাকা অনুরিমার অনেক কাছাকাছি চলে এসছিল। সে তখনও নিজের হাত দিয়ে পরম স্নেহে অনুরিমার এলোকেশী চুলগুলিকে আদর করে যাচ্ছিলো। এত চতুরভাবে যে অনুরিমাকে বুঝতেই দিচ্ছিলোনা এই বন্ধুত্বপূর্ণ স্নেহের আড়ালে লুকিয়ে আছে আদিত্যর আকাঙ্খা, তাকে কাছে পাওয়ার, আপন করে নেওয়ার। যেন তেন প্রকারণে আদিত্য অনুরিমাকে বোঝাতে চাইছিলো যে এখন তার চেয়ে আপন অনুরিমার আর কেউ নেই এই জগতে।
অনুরিমাকে তাই স্বল্প হাসতে দেখে সেও তার সঙ্গ দিয়ে হালকা হাসি হেসে উঠলো। তারপর কিছুটা সিরিয়াস হয়ে সে বললো, “তাই তোমাকে বলছি, এইধরণের ভুল কখনও করোনা। শুধু ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় নয়, বাস্তব জীবনেও করোনা। একবার একটু আপোষহীন জীবন যাপন করে দেখোই না। তোমার যদি আমার অফিসে চাকরি করতে ইচ্ছে না করে, করোনা। তবে তুমি নতুন, আনকোরা। তাই তোমাকে অগ্রিম অ্যাডভাইস দিয়ে রাখতে চাই। শুনবে??..”
“হ্যাঁ”, অকপটে বললো অনুরিমা।
“তাহলে শোনো,,.. যদি অন্য কোথাও চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে যাও তাহলে কখনোই এভাবে বলবে না যে স্বামীর চাকরি চলে যাওয়াতে তুমি চাকরি খুঁজতে এসছো, নাহলে তুমি ঘরেই বসে থাকতে। এরকম বললে তারা তোমার রূপ দেখে তোমাকে এক্সপ্লয়েট করার চেষ্টা করবে। কারণ তারা জেনে যাবে তোমার compulsion চাকরিটা পাওয়ার পিছনে। আর সেটারই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে তখন।….”
কিছুটা থেমে আদিত্য আরো বললো, “দ্বিতীয়ত ফাইভ ইয়ার প্ল্যানিং-এ কখনো এটা বলা উচিত নয় যে তোমার আপনজনেদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে তুমি চাকরি করতে চাইছো, নতুবা তোমার কোনো ইচ্ছেই ছিলোনা চাকরি করার, শুধু টাকার জন্য আসা…. জানি সব মানুষই অর্থ উপার্জনের জন্যই চাকরি করতে আসে। তবুও এধরণের কথা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে নিলে সেটার ইমপ্যাক্ট ইন্টারভিউতে নেতিবাচকভাবেই পড়ে। এরকম ভাবে বললে তোমাকে বড্ড বেশি প্যাশনলেস এবং ভিশনলেস দেখাবে…. কোনো কোম্পানি এরূপ ভাবনা পোষিত মানুষের উপর কেনই বা নিজের রিসোর্স ওয়েস্ট করতে যাবে? তাই না?….”
ছল ছল চোখে স্থির দৃষ্টিতে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে একনাগাড়ে তার বলা কথা গুলো শুনে গেলো অনুরিমা। কি যত্নে ও স্নেহে আদিত্য তাকে একজন অভিভাবকের মতো সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছে, সেটা দেখেই অনুরিমা ইমোশনাল হয়ে পড়ছিলো। কারণ এই মুহূর্তে সে সত্যি খুব একা, কেউ নেই তার পাশে। বাড়িতে শাশুড়ির নিয়মিত তিরস্কার। অপরদিকে ভালোমানুষ কিন্তু স্ত্রীয়ের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য রাখা শশুরমশাইয়ের তাতে কোনো প্রতিবাদ না করা।.. হাজার হোক তিনি বাড়ির কর্তা, তিনি যদি বাড়ির বউয়ের অপমান মুখ বুজে সহ্য করতে থাকেন তাহলে অনুরিমা কার কাছে যাবে বিচার চাইতে? সমীরের কাছে? সে তো অনুশোচনায় এতটাই নিমজ্জিত হয়ে আছে যে এখন তার মুখে রা কাটেনা। তার নিজের মা-কে বলার সাহস নেই যে সে নিজের দোষেই দূর্ঘটনাটা ঘটিয়েছে।
সমীর কি কি ভাবে নিজের স্ত্রীয়ের উপর ফ্যান্টাসি পূরণের নামে মানসিক যাতনা চালিয়েছে তা একমাত্র অনুরিমাই জানে। যার দরুন আজ তাদের স্বামীর স্ত্রীর সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে। মুখে যতই বলুক আদতে শুধু পড়ে রয়েছে দায়িত্ববোধ। ফলে সমীরের মা সত্যি থেকে অজ্ঞাত হয়ে শুধুই নিজের বউমার উপর দোষ চাপিয়ে শাপ-শাপান্ত করে যায় অনবরত।
সমীর-অনুরিমা
তাই সেইদিক দিয়ে নিজের বাবার মতো সমীরও তার মায়ের পরোক্ষ বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে নীরব থাকে। মাঝে মাঝে অনুরিমার হয়ে কথা বললেও অধিকাংশ সময়ে সমীর মৌনব্রতই ধারণ করে। কারণ তার মধ্যে সেই সৎ সাহসই নেই, স্ত্রীকে নিয়ে পূর্বের নিজ সকল ঘৃণ্য প্রবৃত্তি গুলি অকপটে স্বীকার করার। তা করলে সে সামাজিক পুরুষত্ব হারাবে। আর হারানো উচিতও, তখন সে নিজ বাবা মার কাছে সারাজীবনের জন্য ছোট হয়ে যাবে, আর অনুরিমা সকল অপবাদ থেকে মুক্তি পাবে। সেরকম হলে অনুরিমা নিশ্চিত, সমীর নিজের পায়ে একদিন না একদিন দাঁড়াতে পারলেও কখনো সম্মানের সাথে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না আর। কিন্তু অনুরিমা জানে এসব কখনোই বাস্তবে রূপান্তরিত হবেনা। সমীর কখনোই নিজের গোপন নিষিদ্ধ চাহিদা গুলির কথা কারোর সামনে লজ্জায় স্বীকার করবে না, আর তাই অনুরিমাকেই সকল লাঞ্ছনা, অপবাদ গায়ে মেখে বেঁচে থাকতে হবে।
এ সকল কারণের জন্যই অনুরিমার ভরসা করার মতো বা কাউকে আঁকড়ে ধরে মানসিক নিরাপত্তা খোঁজার মতো আর কোনো লোক ছিলোনা। এরকম একটা সময়ে আদিত্যর ভূবন ভোলানো মায়াবী শান্ত্বনা অনুরিমাকে নিজ অজান্তেই আকর্ষিত করছিলো। আদিত্যও নিজে থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখছিলো না। সে ছল প্রয়োগে মাইন্ড গেম খেলে অনুরিমাকে বললো, “এবার তুমি দেখো, তুমি কি করবে? আমার অফিসে চাকরি করবে নাকি অন্য কোথাও ট্রাই করবে? অন্য কোথাও গেলেও আমি তোমাকে ঠিক এইভাবেই গাইড করে দেব, চিন্তা নেই।”
অনুরিমা ও আদিত্য; পাশাপাশি — জাস্ট লাইক আ কাপল
এই কথা শোনার পর সব বাঁধ যেন নিমেষের মধ্যে ভেঙে চুড় চুড় হয়েগেলো। অনুরিমার দূর্বল মন ভাবলো, কেউ এতটা নিস্বার্থভাবে কি করে পাশে এসে দাঁড়াতে পারে তার! আদিত্য বলছে অনুরিমা তার অফিসে কাজ না করলেও সে তাকে প্রপার গাইডেন্স দেবে, যেখানে আইটি সেক্টরে কোম্পানি গুলোর মধ্যে এত rivalry থাকে সেটা জানা সত্ত্বেও! How selfless person he is!!
অনুরিমা তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। সে আদিত্যকে জড়িয়ে ধরলো। বললো তার আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আদিত্য যদি তাকে রাখে, তবে ভালো নাহলে সে ভেসে যাবে। আদিত্য তখন অনুরিমাকে নিজের বাহুবন্ধনে আষ্টে পিষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আশ্বাস দিলো যে আজ থেকে অনুরিমার সকল চিন্তা ভাবনা তার নিজের। সে অনুরিমার সব দায়িত্ব স্ব-ইচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিলো।
কিছুক্ষণ তারা এভাবেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে থাকলো। অনেকদিন পর অনুরিমা নিজেকে খুব সিকিউরড্ ফীল করছিলো। আদিত্যর কেবিনের দরজাটা ছিল Fluted Glass Door, তাই বাইরে থেকে কেউ ভেতরের কিছু দেখতে পারতো না। কিন্তু দরজাটা তখন আনলক ছিল, সূতরাং যে কেউ হঠাৎ করে ঢুকে পড়লে কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়তে হতে পারতো। তবে সবাই জানে ভেতরে ইন্টারভিউ চলছে তাই কেউ আদিত্য স্যারকে ডিস্টার্ব করবে না। আর খুব দরকার পড়লে ঢোকার আগে নক করবে সেটা আদিত্য জানে, তাই সে নির্দ্বিধায়ে সমীরের বিয়ে করা বউ-কে নিজের বউয়ের মতো জড়িয়ে ধরে বসেছিলো।
কিছু সময় পর তাদের চৈতন্য ফিরলো, এবং একে অপরের থেকে স্বল্প দূরে সরে আলাদা হলো তারা। আদিত্য অনুরিমাকে সাত-পাঁচ ভাবার কোনো অবকাশ না দিয়েই তাকে পরের সপ্তাহ থেকে অফিস জয়েন করতে বললো। তারপর অনুরিমার পাশ থেকে উঠে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলো। বেল বাজিয়ে সেই মধ্যবয়সী ভদ্রলোককে ডাকলো। লোকটি আসায় তাকে অনুরিমার গ্রাজুয়েশনের সার্টিফিকেট এবং মার্ক শিটটা হাতে ধরিয়ে ফটোকপি করিয়ে আনতে বলো।
অনুরিমার যেন বিশ্বাসই হচ্ছিলোনা যে ফাইন্যালি সে একটা চাকরি পেয়েছে। ভদ্রলোকটি অনুরিমার ডকুমেন্টস নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই অনুরিমা আদিত্যকে অসংখ্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে লাগলো। প্রসন্নিত আদিত্য তখন তাকে কাজ বোঝাতে লাগলো, অনুরিমাকে কি কি করতে হবে। অনুরিমাকে আদিত্য অ্যাপয়েন্ট করেছিল অ্যাস্ হিস্ সেক্রেটারি, পার্সোনাল নয়, প্রফেশনাল।
অনুরিমা আদিত্যর কাছ থেকে সব কাজ বুঝে নিতে লাগলো। এরই মধ্যে সেই ভদ্রলোক ডকুমেন্টস এর ফটোকপি করিয়ে নিয়ে এলো। আদিত্য সেই ডকুমেন্টস এর ফটোকপি গুলি নিজের কাছে রেখে অরিজিনাল গুলো অনুরিমাকে ফেরৎ দিলো। প্রবীরবাবু অর্থাৎ সেই ভদ্রলোককে আদিত্য অনুরিমার সাথে formally পরিচয় করিয়ে দিতে বললো, “She is our new joinee. She will take the charge from next week in a secretary post. The post of the secretary to the executive manager was vacant since I joined this company. From the first day, the authority suggest me to recruit someone to this post for my working convenience. So, I hired her. I already provide all the necessary instruction to this beautiful lady regarding her job profile. I think she understood her work. But still I give you the responsibility to execute the rest of the formalities regarding this recruitment, so kindly cooperate with her.”
“Sure Sir! ম্যাম, আসুন আমার সাথে….”
অনুরিমা আদিত্যর দিকে তাকালো। আদিত্য তাকে প্রবীর মিত্রর সাথে যেতে বললো। সেইমতো অনুরিমা আদিত্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রবীর বাবুর সাথে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। প্রবীর মিত্র বাকি সকল ফর্মালিটিস গুলো পূরণ করছিলো। অফিসে খবর চাউর হতেই সবাই এসে অনুরিমাকে কংগ্র্যাচুলেট্ করতে লাগলো। অনুরিমার ভালো লাগছিলো এমন একটা ফ্রেন্ডলী অফিস এনভায়ারমেন্ট পেয়ে।
নিজের সব কাজ বুঝে নিয়ে সে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। তার আগে সুচরিতাকে ফোন করে সুখবরটা জানালো। সুচরিতা শুনেই উচ্ছাসে মেতে উঠলো, প্রিয় বান্ধবীর কাছে আবদার করলো ট্রিট দেওয়ার। অনুরিমা বোঝাতে চাইলো আগে চাকরি তে জয়েন করে কাজ করি, প্রথম মাসে স্যালারি পাক, তারপর ট্রিট দেবে সে, কিন্তু সুচরিতা নাছোড়বান্দা। সে অনুরিমার অফিস জয়েন করার পূর্বেই ট্রিট নিয়ে ছাড়বে বলে গোঁ ধরে বসলো। অবশেষে অনুরিমা তাতে রাজি হওয়ায় তবে গিয়ে সুচরিতা ফোনটা রাখলো।
অনুরিমা ভাবলো একবার বাড়িতেও ফোন করে জানাবে, তাদের হয়তো ভালো লাগবে, চিন্তাটা কমবে। সেইমতো ফোনের ডায়াল লিস্টে সমীরের নামের উপর আঙ্গুলটা প্রেস করতেই যাচ্ছিলো কি তখুনি মাথায় একটা ব্যাপার খেললো তার। চাকরিটা তো আদিত্য দিয়েছে তাকে, আর সুচরিতার মতো সমীর যে কিছুই জানেনা তা তো নয়। সমীর সবটা জানে কি কি হয়েছে পূর্বে ওর আর আদিত্যর মধ্যে।….
এখন সমীর যদি জানতে পারে সে আদিত্যর অফিসে চাকরি করবে, তাহলে কিভাবে রিএক্ট করবে সে??.. তাকে তো অনুরিমা সব বলেছে কি হয়েছিল আদিত্যর সাথে হোটেলের রুমে। সমীর আবার ভাববে না তো যে সে এই চাকরি পেতে আদিত্যর সাথে কোনোরকম “কম্প্রোমাইস” করেছে?? না না, সমীরকে এখুনি কিছু বলা যাবেনা। বাড়ি ফিরে ঠান্ডা মাথায় আগে ভাববে কতটুকু বাড়িতে জানানো উচিত, কতটুকু নয়। আজকে বাড়িতে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে বলবে, যেই চাকরির ইন্টারভিউটা দিতে গেছিলো, সেটার ফলাফল এখনও কর্তৃপক্ষ জানায়নি তাকে। ব্যাস! এইটুকুই ইনফরমেশন থাক আজকে বাড়ির জন্য, বাকিটা পরে আনফোল্ড করা যাবে….. এইভেবে সে বাড়ি ফেরার বাসে উঠলো।…..
একটি দুষ্টু কাকোল্ড সেক্স স্টোরি ৩য়
এক বৌয়ের জীবন ১ম পর্ব চটি গল্প
আমার জীবন বাংলা চটি গল্প ১ম পর্ব